Followers

Monday, June 29, 2020

জীবন যাত্রা

ভোরের ট্রেন টা ধরলাম,কাজের সূত্রে হঠাৎ ই যাত্রা,গন্তব্যস্থল শিলিগুড়ি।ট্রেন সময় মতো ছাড়ল______ চোখ পড়ল আমার পাশের  সিটের শিশুটির দিকে ,অনেকক্ষন থেকেই সে তার মায়ের কাছে কিছু একটা বায়না করে যাচ্ছে।
কিছুটা অনুসন্ধিত্সার বশবর্তী হয়েই শিশুটির মা কে জিজ্ঞাসা করলাম_____"আচ্ছা ও এভাবে বায়না করছে কেন?"শিশু টির মা কিছু টা  বিরক্তিকর ভাবেই উত্তর দিল__
"আর বলবেন না প্লাটফর্ম  এ অপেক্ষার সময় ওরই বয়সী এক ছেলের সাথে ওর  বন্ধুত্ব হয়।তাকে ছেড়ে কিছুতেই উঠবে না।এবার আপনি বলুন কীভাবে আমি সেই ছেলেকে এনে দেবো?"
  আমাদের কথোপকথন এ শিশুটি কান্না থামিয়ে তার সহজাত প্রবৃত্তি স্বরুপ আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।আমিও সহর্ষে  তাকে আমার কাছে ডেকে নিলাম এবং ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বের করে দিলাম।বেশ কিছুক্ষণ হাসি ঠাট্টা করে  কাটানোর সাথে সাথে শিশু টির সাথে একটা মিষ্টি সম্পর্ক তৈরী হতে থাকল।
    "আর আপনাকে বিরক্ত করবো না" ___একটু ইয়ারকি করেই মা টি  বলে উঠলো।
আমি বললাম___ "মানে"? 
"আসলে পরের স্টেশন নামতে হবে "
মনটা  একটু খারাপ লাগছে।_____স্টেশনে 
ট্রেনে থামল। ____শিশু টি তার মায়ের হাত ধরে নেমে গেল।আমি জানালা দিয়ে হাত দেখিয়ে হাসতে হাসতে বিদায় জানালাম। 

  প্রায় দশ মিনিট পরে ট্রেন ছাড়ল। সেই সিটে এসে বসল এক স্কুল পড়ুয়া। বসার সাথে সাথেই সে একটা নোটবুক খুলে একমনে পড়তে লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ___কী? পরীক্ষা নাকি?
স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল____"_উফঃ.,,,আজ হলেই শেষ।"
মুচকি হাসি দিয়ে বললাম___"বাহ তাহলে তো বেশ মজা "!
"হ্যাঁ তা আর বলতে।জানো দিদি মা বাড়িতে টিভি, ইন্টারনেট সব কানেকশন বন্ধ করে দিয়েছে  যদি রেজাল্ট খারাপ হয়ে যায় পরীক্ষায় এই ভেবে ।আর জান আমার মা যতরাত্রি  হোক না  কেন আমার সাথে  জেগে  থাকে পড়া শেষ  না হওয়া পর্যন্ত আবার ভোর বেলায় ডেকে দিত____ তখনও ঘুম চোখে ______ তবে আজকের পর টিভি দেখবো,মোবাইল এ গেম খেলব,  ঘুমোব ,বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেব আর ও কতকিছু________"
আমিও তার উদ্বেগ পূর্ন কথা গুলো শুনতে শুনতে নিজের স্কুল জীবনে ফিরে যেতে লাগলাম। কিছুক্ষন পরেই  সে বলে উঠলো 
"দিদি আসছি  আমার স্কুল এসে গেছে পরের স্টেশনে নামতে হবে।"
"ঠিক আছে  সাবধানে যেও। আর পরীক্ষার জন্য অল দ্যা বেষ্ট। "আমি বললাম"।

     ট্রেন ছাড়ল ___পাশের সিটে এসে বসল এক দম্পতি।তাদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে বেশ কিছু ক্ষন কথা কথা কাটাকাটি  চলছে।হঠাৎ করে ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসা করলেন_____
"আপনি কোন মিডিয়াম এ পড়াশোনা করেছেন"? 
আমি বললাম____ "বাংলা ,____আসলে  মাধ্যম  যেটাই হোক শেখা বা শেখানোর মাধ্যম প্রগতিশীল হওয়া দরকার।তবে  আজকাল ইংরেজি মিডিয়াম এর চল টাই বেশী ,তার মানে মাতৃভাষা কে বঞ্চিত করে না ।দুই ভাষাই একে অপরের পরিপূরক,একজন ছাড়া অন্যজন অসম্পূর্ণ। ঠিক যেমন দিন আর রাত____"
"হ্যাঁ, তা ঠিকই বলেছেন"।_দুজনে একসাথে বলল।
"আসলে আমাদের ছেলের জন্য  একটা  স্কুল খোঁজ করছি কিন্তু  কোন  মিডিয়াম এ ভরতি করব সেই নিয়েই আমাদের মধ্যে দন্দ্ব চলছিল"।___ভদ্রলোক টি উত্তর দিলেন। 
     এই বলে তারা নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।বেশ অনেকটা সময়ই তারা ট্রেনে কাটালেন। আমিও দুপুরের খাওয়ার খেয়ে  ঘণ্টা খানেক ঘুম দিলাম।

                       চোখ খুলতে দেখলাম তারা নেমে গিয়েছে।পা‌শে বসে রয়েছেন এক বৃদ্ধা।যেন তিনি আমার জাগার অপেক্ষায় ছিলেন।সংগে সংগে তিনি তার ফোনটা আমাকে দিয়ে বললেন ____

   "চোখের পাওয়ারটা বেড়েছে তাই এত ছোট লেখা দেখতে পাইনা।একটু পড়ে দেবে আমার ছেলে কী মেসেজ করেছে।"
আমি ফোনটা নিয়ে পড়া  শুরু করলাম। মেসেজে যা লেখা ছিলো _________
     "মা, তুমি  কি  ট্রেনে উঠে  পড়েছ? আমরা গতকাল  গোয়া তে এসেছি।এই বছর  আমাদের বিবাহ বার্ষিকী টা এখানেই সেলিব্রেট করব। তুমি আর এসোনা আজ"
   
  শুনে বৃদ্ধা টি  আক্ষেপ করে  একটু মুচকি হাসি হাসলেন।
"তা কোথায় যাচ্ছেন"?____আমি জিজ্ঞাসা করলাম 
  "শিলিগুড়ি আমার ছেলের বাড়ি। আজ ওদের বিবাহ বার্ষিকী।বছরে  এই একটা দিনেই ওদের মুখ দেখতে পাই। সারা বছর দুজনেই খুব  ব্যস্ত থাকে তাই  সকাল  সকাল  পায়েশ রান্না করে  নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ওরা তো এখন __________মেসেজ টা  যদি গতকাল  পাঠাত______অনেক ব্যস্ত  থাকে  তো ভুলে গেছে হয়তো_______"বৃদ্ধা উত্তর  দিলেন

   বৃদ্ধা টির চোখের কোনে  এক বিন্দু  জল  ঠিক  করতে পারছে না পতিত হবে  না  ওখানে থেকে যাবে।নিজের খুব কষ্ট হল।ভাবলাম এ কি  সেই সন্তান  যে মা এর হাত ধরে উঠেছিল ।সাজিয়ে দিয়েছিল আবদার গুলি মা এর কাছে। 
  এ কী সেই সন্তান যার পরীক্ষার ফল  ভাল হওয়ার জন্য মা তার সব বিলাসিতা বিসর্জন দিত।
    এ কি  সেই সন্তান যার ভবিষ্যতের চিন্তায় বাবা মা  নিজেদের স্থির রাখতে  পারত না।___________হয়তো বা_______ ভাবতে ভাবতে  ট্রেন থামল শিলিগুড়ি স্টেশনে।
   সব লাগেজ গুলো নিয়ে নামলাম প্লাটফর্মে।প্রায় সন্ধা তখন।রওনা দিলাম  অফিস এর দিকে।সূর্যের বিদায় বেলার  ক্ষীণ আলোয় পেছন ফিরে দেখলাম বৃদ্ধা টি  প্লাটফর্মেই বসে হয়তো বা ফেরার ট্রেনের অপেক্ষায়।

           ঠিক  এই  ট্রেনের যাত্রার মত  আমাদের জীবন এর যাত্রা ও শৈশব থেকে  শুরু হয়  বার্ধক্য তে শেষ  হয় তার গন্তব্যস্থান।এই একটা  যাত্রায় আমি  জীবনযাত্রার প্রতিটি পর্ব অতিবাহিত হওয়ার উপলব্ধি করলাম। 



                            চিত্রা অধিকারী

   

No comments:

Post a Comment

নববর্ষ